আমিতো আমি নই, আমিতো অন্য কেউ! পর্ব- ১
জানেন কি, আমরা যে কাজগুলো করে থাকি, বা আমরা যা ভাবি কিংবা করি তার মাত্র ৫% আমাদের মনের সচেতন অংশ (Conscious Mind) নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ৯৫% নিয়ন্ত্রণ করে অচেতন অংশ (Subconscious Mind)! কিভাবে সম্ভব? প্রমাণ লাগবে? পড়তে থাকুন।
প্রথমেই বলে নেই যে, লিখাটা Zero to Infinity Talks এর সপ্তম Episode – Zero to Infinity Talks – The Secret Pattern of Successful Minds এর উপরে লিখা। সোহাগ ভাই ছিলেন বক্তা। কথাগুলো এতটাই ভালো লাগে যে এটা নিয়ে আরও পড়া এবং লিখা শুরু করলাম। এক-পর্বে শেষ করা যাবে না। তাই পর্বে ভাগ করে ফেললাম। যারা যেতে পারেন নি কিন্তু অনেক আগ্রহ ছিল তারা এটা পড়ে দেখতে পারেন। আবার আমাদের মন কিভাবে কাজ করে এটা নিয়ে কিছু মজার তথ্যও পাবেন।
এই পর্বের কথাগুলো বেশিরভাগই Mahmudul Hasan Sohag ভাই যেভাবে বলেছেন ওভাবে লিখার চেষ্টা করলাম। যদিও ওনার মত করে গুছিয়ে লিখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাও চেষ্টা দিলাম আর কি। আশা করি সোহাগ ভাই মাফ করে দিবেন এই অযোগ্যতা।
প্রথমেই জেনে নেয়া যাক Success কি? অনেক মানুষই এটাকে অনেক রকমভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এক এক মানুষের কাছে এটা এক এক রূপে ধরা দেয় বা মানুষ তা মনে করে। সোহাগ ভাইয়ের মতে, Success হলো Happiness. আপনি যদি মনে করেন আপনি সুখে আছে বা সুখী তাহলেই আপনি সফল। আপনি দুইদিন না খেয়ে আছেন। কিন্তু আপনি খুশি এবং সুখী। তাহলেই আপনি আপনার জীবনে সফল। বাড়ি-গাড়ি দিয়ে কি হবে যদি সুখে না থাকেন?
সুখের সংজ্ঞাও আবার জনে জনে পরিবর্তিত হয়। সুখের সাথে আবার চাহিদা জড়িয়ে আছে। যেমন ধরেন আপনার ২টা জামা আছে। কিন্তু আপনি চিন্তা করলেন যে, আপনার যদি ২০ টা জামা থাকত! হয়তো ২০টা জামা হয়ে গেলেই ভাববেন আপনি সুখী বা সফল হয়েছেন লক্ষ্যে। কিন্তু দেখা গেল ২০টা জামা হওয়ার পরে আপনি জানতে পারলেন যে একজনের ৫০০টি জামা আছে। হায় হায়! মাত্র ২০টা জামার আমার। ওই বেটার ৫০০+ জামা। কেমনে আমি ওই অবস্থানে যাবো!
দেখা যাবে আপনার অশান্তি আরও বেড়ে গেছে। আগে আপনার অশান্তি ছিল ১৮টা জামা নিয়ে। আর এখন অশান্তি ৪৮০টা জামা নিয়ে!!!
তার মানে সুখটা মনের ভিতরে এবং আপেক্ষিক। আপনার মন যদি মনে করে আপনি খুশি, আপনার যা দরকার সব আছে তাহলেই আপনি সুখী।
এটা গেল একটা দিকের চিন্তার কথা। এখন সাধারণ চিন্তায় আমরা সফলতাকে কিভাবে দেখি? একজন মানুষ যদি সফল হয় তাহলে সে কেন সফল হয়েছে বলে আমরা মনে করি?
আমাদের আশেপাশেই অনেক সফল মানুষ আছে। তারা কিভাবে সফল হয়েছে বলে আমরা ভাবি? চোখ বন্ধ করে ৫টা কারণ খুঁজে বের করুন তো। কি কি পেলেন?
১. নিয়মানুবর্তিতা
২. পরিশ্রম
৩. পরিকল্পনা করে এগিয়ে যাওয়া
৪. খুব বুদ্ধিমান বা টেলেন্ট
৫. পজিটিভ মেন্টালিটি।
মোটামুটি সব সফল মানুষের মাঝেই আমরা এইসব গুণগুলো দেখতে পাই। এইসবই সফলতার সিক্রেট বলে মনে করি।
কিন্তু সিক্রেট আসলে কি? এইসবই কি আসলেই সফলতার মূল রহস্য?
আচ্ছা আপনি যদি, আজকে থেকে ঠিক করেন যে আমি বিল গেটস, জুকারবার্গ বা অন্য সফল ব্যক্তিরা যেভাবে ভাবেন, কর্ম করেন ঠিক সেভাবেই চলবেন তাহলে আপনি কি তাদের মত সফল হতে পারবেন? বা আপনি কি তাদের মত করে প্রতিদিন সব ঠিকমত করতে পারবেন?
উত্তরটা সহজ। আপনি পারবেন না। কেন পারবেন না? কোথায় সমস্যা? ভাবতে থাকুন আপাতত।
আমরা অনেক সময় দাবী করি যে, সফল মানুষকে বেশি বুদ্ধি দিয়ে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। আমাদের ব্রেন কম তাই সম্ভব না। এই চিন্তাটা মোটেই সঠিক নয়। এটা নিয়ে খুব সুন্দর একটা উদাহরণ দিয়েছেন সোহাগ ভাই।
ধরুন, একটা নতুন কম্পিউটার। কোর আই ৭ প্রসেসর, ১৬জিবি র্যাম এবং অন্যান্য সবই খুব ভালো কনফিগারেশনের। কিন্তু এর মাঝে কোন সফটওয়্যার বা অপারেটিং সিস্টেম নেই। তাহলে এত এত ভালো কনফিগারেশনের কি কোন মূল্য আছে? বরং একটা প্যান্টিয়াম ২ এর কম্পিউটারও অনেক কাজের যদি নানান প্রোগ্রাম ইন্সটল করা থাকে।
মানুষের প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। এর মাঝে সবগুলোকে একইসাথে এবং সঠিকভাবে ব্যাবহার করা সম্ভব হয় না। দেখা যায় যে, ৮% ব্যবহার করে একজন সাধারণ মানুষ। আর কিছু কিছু মানুষ আরও বেশি ব্যবহার করতে পারেন। যেমন: আইনস্টাইন। তিনি ১১% ব্যবহার করেন। যদিও এই ব্যাপার শুধুই ফোকাস করার ক্ষেত্রে। মতবিরোধও আছে কিছু।
যাই হোক, যেটা মূল কথা তা হলো অনেক অনেক বেশি নিউরন আছে আমাদের। মানে আপনাকে দুনিয়াতে ভালো মানের হার্ডওয়্যার দিয়ে পাঠানো হয়েছে। আপনার যা করতে হবে হা হলো নতুন নতুন প্রোগ্রাম ইন্সটল দেয়া। সফল ব্যক্তিদের দিকে খেয়াল করলেই দেখবেন এরা প্রচুর বই পড়ে। এর কারণ কি মনে হয় আপনার?
যাই হোক এই পর্বের লিখাটা শেষ করি। শেষ করার আগে অল্প কিছু কথা এবং হিন্টস দিয়ে যাই।
সফলতার জন্য আমরা ৫টি গুণ চিন্তা করেছিলাম। সত্যি বলতে গেলে এইগুলোই সফলতার মূল কারণ বা সিক্রেট নয়। মূল কারণ ওগুলোই যা দেখা যায় না। যা অপ্রকাশিত। একজন সফল মানুষের সফলতাগুলোই প্রকাশ পায়। তার ব্যর্থতাগুলো রয়ে যায় অন্ধকারে। একজন সফল মানুষের মত সবকিছু করার ইচ্ছা থাকলেও দেখা যাবে যে আপনি করতে পারছেন না। কেন পারছেন না এটাই রহস্য!
পরীক্ষার সময় সবারই মনে হয় যে, আমাদের ঠিকমত পড়া দরকার। এই পরীক্ষা শেষ হলে পড়ে ফাটাই ফেলবো। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হতেই আমরা ভুলে যাই এইসব। কেন?
আমারা যারা সকালে দেরীতে ঘুম থেকে উঠি তারা প্রায়সময় ঠিক করি যে, সামনে থেকে একদম ভোরে ঘুম থেকে উঠবো। কিন্তু শপথ করা সত্ত্বেও আমরা ঘুম থেকে উঠতে পারি না। একদিন-দুইদিন উঠলেও এরপর থেকে আর পারি না। কেন?
প্রথমেই বলেছিলাম আমাদের সব কাজকর্মের মাত্র ৫% নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের মনের বা মস্তিষ্কের সচেতন অংশ। বাকিগুলো করে অবচেতন মন বা Subconscious mind. কিভাবে?
এইযে, আমরা নিশ্বাস নিই, হাটি, হাসি, কাঁদি এইসব কি আমরা খুব ভেবেচিন্তে করি? কথাবলার সময় আমরা হাত-পা নাড়ি। কিন্তু আমরা কি এই কাজটা সচেতন ভাবে করি? না এইগুলো আমাদের Subconscious mind নিজে নিজে করে। যদি এইগুলো সচেতন ভাবে করতে যেতাম তাহলে আমরা খুব বিপদে পড়ে যেতাম। নিশ্বাস যদি সচেতন ভাবে নিতে হত তাহলে দেখা যেত যে খুব জরুরী কোন কাজ করতে গিয়ে নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছি। তখন অবস্থা খারাপ।
আরেকটা ব্যাপার। আমাদের অবচেতন মন কিন্তু ভার্চুয়াল এবং বাস্তবের মাঝে আলাদা করতে পারে না। তার কাছে সত্যিকারের মানুষ আর তাদের ছবি একই। প্রমাণ চান?
আপনি যখন সিনেমা দেখেন, তখন দু:খের সময় দেখবেন কেঁদে দিচ্ছেন। না কাঁদলেও দেখবেন কাছাকাছি অবস্থায় চলে গেছেন। আবার যখন গেইমস খেলেন, দেখবেন যে খেলার মত করেই আপনি দুলছেন। আপনি জানেন যে এইসব মিথ্যা। কিন্তু দেখবেন তাও আটকাতে পারছেন না।
স্বপ্ন দেখে আমরা হাসি বা কেঁদে উঠি। এই কাজটাও কিন্তু আমরা সচেতন ভাবে করি না। অনেক সময় ঘুম ভেঙ্গে দেখবেন চোখ ভিজে গেছে। কিন্তু আপনিতো সচেতন ভাবে কাঁদেন নি। তাহলে আপনাকে কে কাঁদাল? কে আপনার অশ্রু বের করার জন্য হরমোন বা অন্য কাজগুলো করলো? ব্রেনকে কে কমান্ড দিলো?
উপরে অনেকগুলো কেন এর উত্তর এই অবচেতন মন। আপনি সচেতনভাবে ঠিক করেন যে, কালকে থেকে আপনি পড়বেন। নিয়মিত পরিশ্রম করবেন। এই চিন্তা আপনার ৫% সচেতন মানসিকতার। বাকি ৯৫% Subconscious mind এটা এন্টিতে থাকে। আর তাই আপনি চাইলেও পারেন না সহজেই খারাপ জিনিসগুলো বাদ দিতে।
তাইতো বলা যায়, আমিতো আমি নই, আমিতো অন্য কেউ!
পরের পর্বে থাকবে:
1. Bruce Lipton এর কথা। ৩টি বড় ভুল ধারণা যা নিয়ে আমরা পড়ছি এবং জানছি নিয়মিত।
2. কেন পরিশ্রম, নিয়মানুবর্তিতা সফলতার মূল জানার পরেও আমরা পরিশ্রমী হতে পারি না?
একটা Quote দিয়ে শেষ করি,
In the beginner’s mind there are many possibilities, but in the expert’s mind, there are few. ”
― Shunryu Suzuki













