“দেখিস রাস্তাঘাটে কোন ঝামেলায় জড়াইসনা। সাবধানে যাইস। কোন ঝামেলা দেখলে ওখানে গিয়ে দেখার দরকার নাই। তোর তো আবার আগ্রহ বেশি। নিজের মত যাবি আবার নিজের মত চলে আসবি। শত্রু বাড়ানোর দরকার নাই। “- মোটামুটি বাসা থেকে বাইরে বের হওয়ার সময় বাবা,মা, ভাই, বোন, স্বামী বা স্ত্রী, আত্মীয় স্বজনরা এইরকম কথা সবসময় বলে। আমিও শুনতে শুনতে বড় হইছি এমন কথাগুলো।
খুব ছোটবেলা থেকে আমরা ছোটদের মাইন্ডসেট তৈরি করে দিচ্ছি বা বড়রা আমাদের মাইন্ডসেট তৈরি করে দিচ্ছেন। আমরা এখন যে পরিবেশে বড় হচ্ছি এখানে স্বাভাবিকভাবে বা সাধারণত ২ রকমের মন-মানসিকতায় আমরা বেড়ে উঠি।
১. কোন ঝামেলা দেখলে দূরে থাকতে হবে। কোন কিছুর প্রতিবাদ করার দরকার নাই যদিনা নিজের উপরে এসে পড়ে। সুবিধাবাদী একটা অবস্থানে থাকতে হবে এবং সুবিধে পেলেই নিতে হবে তা ন্যায় বা অন্যায় যাই হোক না কেন।
২. সবকিছু এখন নষ্টদের অধিকারে। ভালো মানুষ হয়ে কোন লাভ নাই। নিজের ক্ষমতা বাড়াও তা রাজনীতি করে হোক, গ্রুপিং করে হোক। চাঁদাবাজি করে, এখানে ওখানে জোরাজুরি করে হলেও নিজের আখের গুছাও। কে কি বললো তাতে কিছু যায় আসে না। নিজের যা ইচ্ছে কর।
# ভার্সিটিতে যখন একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় তখন তার অনেকগুলো প্রত্যাশা থাকে, স্বপ্ন থাকে। ২-৩ মাসের মাঝেই সে বুঝে যায় যে ভার্সিটির বাস্তবতা তার চিন্তার মত না। এখানে শুধু পড়ালেখা না, আরও অনেক কিছু চলে। আরও কিছুদিন পরে সে নিশ্চিত হয়ে যায় এখানে পড়ালেখার থেকে অন্য অনেক কিছুই বেশি চলে। সে প্রতিনিয়ত দেখতে থাকে নানা দুর্নীতি এবং অনিয়ম। ছোটবেলা থেকে গড়ে উঠা মাইন্ডসেট এবং বর্তমান ভার্সিটির অবস্থা দেখে সে হয় সুবিধাবাদী অবস্থানে চলে যায় নয়ত সে জড়িয়ে পড়ে নষ্টামিতে। সুবিধাবাদী অবস্থানে গেলে পড়াশোনা হয়, একটা রেজাল্ট হয় এবং শেষে ভালো চাকুরী হওয়ার চান্স থাকে। এখানে কারও শত্রু হওয়া লাগে না। কোন কিছুর প্রতিবাদও নাই। এরা সব দেখে, সমালোচনা করে, হা-হুতাশও করে। দিনশেষে নিজের সুবিধেটুকু বুঝে নিবে।
আর নষ্টদের দলে যারা যোগ দেয়, তাদের শত্রু হয়। তারা পাশবিক আনন্দ নিতে চায় সব কিছু থেকে। পড়াশোনা থেকে তাদের বেশিরভাগই অনেক দূরে চলে যায়। এদের শত্রু হয়, গ্রুপিং হয়। মারামারি এদের ডালভাত। কাউকে সম্মান করার দরকার নাই এদের, তবে পা চাটে। নানান রিকমেন্ডশনে তারা এর-ওর ডান-বাম হাত হয়। পরে চাকুরী পায় রিকমেন্ডেশনে বা বিদেশে চলে যায় বা ধামাধরা বাহিনী হয়ে যায়। এরা এই দখল, ওই দখল করে অন্য-লেভেলের মজা পায়। সবাই এদের গালি দেয় আবার দেখা হলে তোয়াজ করে। ভার্সিটি প্রশাসন এদের সাথে তাল মেলায় বা এদের গালি দেয়। তবে প্রশাসনে আবার সুবিধাবাদী পন্থি বেশি হওয়াতে এদেরও খুব একটা সমস্যা হয় না।
দেশের রাজনীতিবিদরা আবার এদের খুব চায়। এদের খুব দরকার তাদের। তাই এরা যা খুশি তা করে বেড়াতে থাকে বা চায়।
–> মোটামুটি সব জায়গায় এখন এই অবস্থা। আপনি আমি যখন নিজের সন্তান, ভাই, ছেলে বা মেয়েকে বের হওয়ার সময় বলে দিই কোন ঝামেলাতে না জড়াতে সেখানে আবার কোথাও কোন কিছু ঘটলে কেন চিৎকার করে উঠি, কেউ প্রতিবাদ করে না বলে? আপনিতো নিজেই প্রতিবাদ করতে নিষেধ করে দিয়েছেন।
–> আপনার কাজ যখন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার ব্যবস্থা করা তখন আপনি সুবিধাবাদী অবস্থানে থেকে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করছেন। সেখানে আপনার মুখেতো মানায় না যে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সব, পরিবারের দোষ এইসব বলা। আপনার জন্যই তো ভালো মানসিকতার শিক্ষার্থী এসে অনিয়ম শিখতে এবং করতে বাধ্য হয়।
–> আপনি দেশ চালাচ্ছেন। আপনার নজর দেয়া উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে প্রকৃত শিক্ষা হয়। ভার্সিটি যাতে ভার্সিটির মত থাকে। তা না করে আপনি আপনার সুবিধার জন্য নষ্ট পরিবেশ তৈরি করছেন এবং করার সুযোগ দিচ্ছেন। আবার আপনিই শিক্ষার্থীদের গালি দিবেন?
–> আপনার কাজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর আপনি দাড়িয়ে দাড়িয়ে সুবিধাবাদী অবস্থায় তামাশা দেখবেন। এরপর আবার বড় বড় কথা বলবেন, গালি-গালাজ করবেন তা তো হয় না। আপনি ঠিক থাকলে তো এত কিছুই হতই না। অবশ্য আপনিও তো উপরের দুই রকমের যে কোন একটা!
আমরা ছোটবেলা থেকে যেভাবে বড় হচ্ছি বড় হয়ে ওইরকম আচরণ করছি। এর মাঝে উপরের ২ রকমের মানসিকতায় আমাদের মাঝে গড়ে উঠছে। এর বাইরে ৩য় একটা মানসিকতা খুব কষ্টে এবং অস্বাভাবিকভেব আমাদের অতি অল্প কিছু মানুষের মাঝে গড়ে উঠে যারা একটু ভালো কিছু করতে চায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চায়। কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই কম। এদের সাথে কেউ থাকে না। এরা মার খায় সবার। কিছুটা উঠে আবার পড়ে যায়। আবার উঠে দাড়ায়। যাদের এখন সব বিবেক শেষ হয়ে যায়নি তারা কিছু করতে না পারলেও অন্তত এদের পাশে দাড়াতে পারে। এরা যখন পড়তে যায় তখন অনন্ত টেনে তুলতে পারে। তাহলে হয়ত এদের পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়বে।
আর একটা কাজ করতে পারি আমরা। নিজের পরিবারের সদস্যদের বলতে পারি, বের হয়ে কোথায় অন্যায় দেখলে অন্তত একবার হলেও বলিস যে, এইটা ঠিক হচ্ছে না। এরপর অবস্থা বুঝে খিঁচে একটা দৌড় দিস। তাও না দেখার ভান করে চলে যাইস না।













