এক পেশাজীবীর মানুষদের সাথে অন্য পেশার মানুষদের সম্মানের দূরত্ব

89

খুব ধীরে ধীরে ভেবে চিন্তে আমাদের দেশে একটা ব্যাপার তৈরি করা হয়েছে। তা হলো এক পেশাজীবীর মানুষদের সাথে অন্য পেশার মানুষদের সম্মানের একটা দূরত্ব। এই পেশার লোক বড়, ওই পেশার লোকের যোগ্যতা কম এইরকমের একটা চিন্তাভাবনা। সব পেশার লোকদের একটা সম্মান থাকে। যার যার জায়গা থেকে সেই সেরা। আর সবচেয়ে বড় কথা তারা মানুষ। তাদের সমান অধিকার রয়েছে। খুবই কষ্ট লাগে যখন দেখি শিক্ষক হওয়ার পর থেকে আমাকে নিয়ে আশেপাশের মানুষদের চিন্তাভাবনা হঠাৎ করে রাতারাতি পাল্টে গেল। এটা ঠিক যে পেশাগত কারণে কিছুটা পরিবর্তন আসবেই। কিন্তু যারা আগে আমার সাথে ঠিকভাবে হয়ত কথাই বলতেন না তারা এখন আমার কাছে পরামর্শ চাচ্ছেন। খুবই অদ্ভুত!

শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে একটা আন্দোলন হচ্ছে। এই আন্দোলনটা খুবই যৌক্তিক। কিন্তু দু:খজনক বিষয় হলো এই যৌক্তিক আন্দোলনকে অনেকেই যৌক্তিক বলে ভাবছেন না। আবার অনেক শিক্ষার্থীরাই আক্ষেপ যে তারা বলী হচ্ছে। একটা সময় কোন শিক্ষক সমস্যায় পড়লে সবার আগে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসত। কিন্তু এখন আর আসে না। কেন তারা এগিয়ে আসে না তা কিন্তু খালি চোখেই দেখা যায়। সত্যি বলতে গেলে আমরা শিক্ষকরা আমাদের সেই সম্মানের জায়গাটা রাখতে পারিনি। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার যে পরিবেশ তা আমাদের দেশে বর্তমানে ঠিকভাবে নেই। নষ্ট একটা পরিবেশে টিকে থাকার মর্মান্তিক চেষ্টা করে যাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই। এখানে সবাই হয়ে যাচ্ছে বলীর পাঠা। তবে এইটুকু দৃঢ়ভাবে বলতে পারি এখনও যেটুকু পরিবেশ টিকে আছে তাও শিক্ষকদের কারণেই। নয়ত অনেক আগেই হারিয়ে যেত আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা। তিল তিল করে ধ্বংস করা হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। আমি যখন পড়তাম তখন আমি অবাক হয়ে মাঝে মাঝে ভাবতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায় এসে আমি কিভাবে সারাদিনে এত সময় পাই! তার থেকেও অদ্ভুত ব্যাপার হলো পরীক্ষার আগে কিছুদিন পড়েই মোটামুটি একটা রেজাল্ট করে ফেলা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের কাছে পড়াশোনাটা এখন আর প্রধান ব্যাপার নেই। তাদের মাথায় কোন অদ্ভুত কারণে ঢুকে বসে আসে বিশ্ববিদ্যালয় আনন্দ ফুর্তির জায়গা। তাই দিনের দিনের দিন বই স্পর্শ না করেও তারা পার পেয়ে যায়, হয়ে যায় ডিগ্রি। এই ব্যাপারটা ভাঙতে হবে। প্রচুর পড়তে হবে, জানতে হবে। আর শিক্ষকদেরও তাদের জায়গা সমুন্নত রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ যদি পড়ালেখা, গবেষণার বাইরে অনেক সময় পায় তখনই যে উল্টা-পাল্টা কিছু ভাবার এবং করার সময় পায়। আর এতে করেই নষ্ট হচ্ছে পড়াশোনার পরিবেশ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক।

কারও আন্দোলনের কারণে অন্য কারো ক্ষতি হওয়া উচিত নয়। দ্রুতই সকল অচলাবস্থার অবসান হোক। কিভাবে কি করলে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তবে এটা ঠিক যে এখন যে আন্দোলন তা মর্যাদার। শিক্ষকদের যদি মর্যাদাহানি হয় তাহলে তা পুরো জাতীর জন্যই ক্ষতিকর। কেননা বর্তমানে যারা শিক্ষার্থী তাদের থেকেই আসবে নতুন শিক্ষক। তাদের মর্যাদার স্থানটা ঠিক রাখাও বর্তমানদের দায়িত্ব। তাই সবার সহায়তায় দ্রুত সকল সমস্যার সমাধান হোক। শিক্ষকরা সকল দিক থেকে তাদের মর্যাদা ফিরে যেন পায়। আর শিক্ষার্থীরা যেন পায় পড়াশোনার সুন্দর পরিবেশ।

Comments

comments